-
by সোহানুর রহমান
-
বরিশাল
-
২৯ ডিসেম্বর ২০১২
-
২৩:৩৪
-
সুশাসন 
ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় প্রতিনিধি সোহেল। চার বছর আগে চাকরি নিয়ে গ্রামের বাড়ি ছেড়ে বরিশাল নগরের বাংলাবাজার এলাকায় ভাড়া বাড়িতে ওঠেন। বাড়িভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে মালিকের সঙ্গে ঝামেলা এড়াতে চার বছরে তিনি অন্তত ১৭ বার বাসা পরিবর্তন করেছেন। এর পরও বাড়ির মালিকদের সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্ব ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে বলে তিনি জানান।
বাড়িভাড়া বিষয়ে জানতে চাইলে ক্ষোভ প্রকাশ করে সোহেল বলেন, 'চার বছরের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয় মহানগরের সব ভাড়া বাড়ির মালিক একই রকম। বর্তমান মালিকও দুই মাস না যেতেই চলতি মাসের শুরুতে ফের ভাড়া বাড়িয়েছেন। এর আগে অন্য এক মালিকের কাছে ভাড়া বাড়ানোর কারণ জানতে চেয়ে বিপদে পড়েছিলাম। বাগবিতণ্ডার দুই দিন পরই ওই বাসা পরিবর্তন করি। ২০০৮ সালে বরিশালে আসার পর ৬০০ টাকার ভাড়া বাড়তে বাড়তে এখন বিদ্যুৎ ও পানির বিল বাদেই এক হাজার ৮০০ টাকা দিতে হচ্ছে। মাস শেষ হয়ে এলেই চিন্তায় থাকি, আবার কখন বলেন ভাড়া বাড়িয়ে দিতে হবে।'
শুধু সোহেল নন, বরিশাল মহানগরের প্রায় সব ভাড়াটিয়া ভাড়া নিয়ে ত্যক্ত-বিরক্ত। বরিশাল সিটি করপোরেশনে (বিসিসি) বাড়িভাড়া নিয়ে কোনো নীতিমালা তৈরি হয়নি। সরকারি পর্যায়ে আইন থাকলেও এর কোনো খসড়া খুঁজে পাননি জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। বিসিসির হিসাব মতে, বরিশাল মহানগরে প্রায় ২৫ হাজার হোল্ডিং রয়েছে; আবাসিকের সংখ্যা ছয় লক্ষাধিক। তাদের মধ্যে বেশি ভাগই ভাড়াটিয়া। এসব ভাড়াটিয়ার মধ্যে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকলেও সবচেয়ে বেশি রয়েছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। তারা নগরের কলেজ রোড, পশ্চিম ও পূর্ব কাউনিয়া, বটতলাসহ বিভিন্ন এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে। ভাড়াটিয়াদের মধ্যে উচ্চ আয়ের লোক থাকলেও এর বড় একটি অংশ নিম্ন ও মধ্য আয়ের। তাই ইচ্ছামতো ভাড়া বাড়ানোর কারণে এসব মানুষ মালিকদের কাছে একরকম জিম্মি হয়ে পড়েছে। এ কারণে মাস শেষে মালিকদের সঙ্গে তাদের বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়া নিত্যনৈমত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে তাদের অভিযোগ। তবে বেশির ভাগ বাড়ির মালিক ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের কথা স্বীকার করলেও ন্যায়সংগত কারণেই ভাড়া বাড়ানো হচ্ছে বলে দাবি করেন।
কলেজ রোড এলাকার ভাড়াটিয়া ব্রজমোহন কলেজের সমাজবিজ্ঞান চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আলমগীর হোসেন বলেন, 'কলেজে ভর্তির পর ছাত্রাবাসে সিট না পেয়ে মেসে উঠি। এখানে ছোট আকারের একটি কক্ষে তিনজন থাকতে হয়। শুরুতে আমি ২৫০ টাকা ভাড়া দিলেও এখন বিদ্যুৎ বিল বাদে ৭০০ টাকা দিই। এ জন্য কয়েকবার মেস পরিবর্তনও করেছি; কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। সব জায়গায় একই অবস্থা। এর আগে এক মেসের মালিকের সঙ্গে ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে কথা বলতে গেলে তাঁর সঙ্গে একেবারে হাতাহাতি অবস্থা হয়।'
কাউনিয়া এলাকার ভাড়াটিয়া শিক্ষার্থী সিরাজুল ইসলাম ও আল আমিন বিশ্বাস বলেন, 'নগরের মেসগুলোর মধ্যে এ এলাকায় সবচেয়ে ভাড়া কম। এর পরও প্রতি মাসে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে সাড়ে ৫০০ টাকা দিই। এ কারণে অন্তত চারবার বাসা পরিবর্তন করেছি। ভাড়ার বিষয়ে মালিকদের কিছু বললেই বলেন, না থাকতে পারলে বাসা ছেড়ে দেন। কিন্তু বাসা পরিবর্তন করতে যে ঝামেলা তা একমাত্র যে করে সেই জানে।'
ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে ঝামেলার কথা স্বীকার করে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক মালিক বলেন, কিছুদিন পরপর জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া হোল্ডিং ট্যাক্স, পানি বিলসহ যাবতীয় খরচ ক্রমেই বাড়ছে। সে হিসাবে স্বাভাবিকভাবে বাড়িভাড়া বাড়ানো হয়।
এদিকে বাসা ভাড়ার আইন সম্পর্কে জানতে গেলে অনেক খুঁজেও এর খসড়া পাননি জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার তরফদার মাহমুদুর রহমান। শেষে ওয়েবসাইটের একটি ঠিকানা ধরিয়ে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, 'ভাড়া নিয়ে মালিক-ভাড়াটিয়াদের মধ্যে দ্বন্দ্বের কথা প্রায়ই শুনি। দেশে অনেক আইন আছে, কিন্তু কয়টার আর প্রয়োগ হয়। জেলা প্রশাসনে এ আইন কোনো কাজে না লাগায় খসড়া রাখা হয়নি। তবে ওয়েবসাইটের ঠিকানায় এর খসড়া পাবেন।' বিসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিখিল চন্দ্র দাস বলেন, বিসিসিতে বাসাভাড়া নিয়ে কোনো নীতিমালা করা হয়নি। শিগগিরই নীতিমালা করার কোনো পরিকল্পনাও নেই।
লাইক:
0
দেখা হয়েছে: ০ বার