-
by এসএম নাজের হোসাইন
-
চট্টগ্রাম
-
২৪ জুলাই ২০১১
-
১৩:০৫
-
সুশাসন 
পবিত্র রমজান, ঈদ, পুজা-পার্বন এলেই আমাদের দেশে ব্যবসায়ীরা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়ে জনজীবনে অসহনীয় পরিবেশ তৈরী করে থাকে। রমজানকে সামনে রেখে অনেক মৌসুমী ব্যবসায়ীর আর্বিভাব ঘটে, এ সমস্ত ব্যবসায়ীরা রমজান উপলক্ষে চিনি, ছোলা, ডাল, চাল, সয়াবিন, খেজুর, পাঞ্জাবী, শাড়ী ইত্যাদি পণ্যের পসরা সাজিয়ে থাকে। অনেক আবার ডিও ব্যবসার ন্যায় পণ্যদ্রব্যের আমদানি ও বাজারজাত করে থাকেন। জানা যায় এসমস্ত ব্যবসায়ীরা বলে থাকেন রমজানে একমাস ব্যবসা করবো, সারা বছর আরামে কাটাবো। পবিত্র রমজান মাস মুসলিম বিশ্বের জন্য আল্লাহ দান এবং এটি সংযম নাজাতের মাস যা পাপ মুক্তির মাস হলেও এ সমস্ত মৌসুমি ব্যবসায়ী নামধারী মূল্য সন্ত্রাসীদের কারনে জনজীবন হয়ে উঠে অসহনীয় ও যন্ত্রনাদায়ক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইতিহাস দেখলে জানা যায়। পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে রজমানের পণ্যসামগ্রী, পবিত্র বড় দিন উপলক্ষে ইউরোপে ও আমেরিকার দেশগুলিতে পণ্যসামগ্রহীর বাজারে মূল্যহ্রাস প্রথা চালু আছে। কিন্তু তার বিপরীতে আমাদের দেশে পরিস্থিতি উলটো। রমজান, ঈদ বা পুজো আসলেই আমাদের দেশের খুচরো থেকে মাজারী ও বড় ব্যবসায়ীরা সাধারন ভোক্তাদের পকেট কাটার উৎসবে মাতোয়ারা হন। ফলে জনগনের জনজীবন হয়ে উঠে নাভিশ্বাস।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লেই আমরা প্রায়শঃ সরকারকে দোষারূপ করে থাকি। এটি ঠিক যে, সরকারের যথাযত মনিটরিং এর দুর্বলতার সুযোগে কিছু মুনাফাখোর, মজুতদারী, সিন্ডিকেট ও অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমুল্যের উর্ধ্বগতির কারনে আজ নাগরিক জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠে। একশ্রেণীর নীতি আদর্শহীন, অতি মুনাফালোভী, অসাধু ব্যবসায়ীদের দিনে দিনে কোটিপতি হবার বাসনায়, তাদের ইচ্ছামতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য দ্রব্যের সরবরাহে সংকট সৃষ্ঠি করে ও দাম বাড়িয়ে দিয়ে সাধারন মানুষের জীবন যাত্রা অচল করে দিয়েছে। যার ফলে সাধারন মানুষের জন্য জীবন জীবিকা নির্বাহ করা কঠিন ও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ব্যবসায়ীরা আর্ন্তজাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে দাম বাড়ালেও ঐ পণ্যের আর্ন্তজাতিক মুল্য কমলেও তারা আর কমায় না। আর যখনই কোন পণ্যের দাম বাড়ে জনগণ হুমড়ি খেয়ে পড়ে, দাম বাড়ার গুজবে নিজেরাই ঐ পণ্যের মজুতে তৎপর হয়ে উঠে। ফলশ্রুতিতে সংকট আরও ঘনিভূত হয়। আমাদের সকলের জানা গত বছর ভারতে পিয়াজের দাম বৃদ্ধি হলে, পুরো ভারত বর্ষে ভোক্তারা পেয়াজ কেনায় সাশ্রয়ী হয়ে উঠেন এবং বিকল্প ব্যবহার শুরু করেন। ফলে একপর্যায়ে ভারতে পিয়াজ এর মূল্যবৃদ্ধি স্তমিত হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে পেয়াজ এর মূল্য এত কমে যায় যে অনেক ব্যবসায়ী পিয়াজ বিক্রি করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত অনেক টাকা গচ্ছা দিতে হয়। কিন্তু একজন সাধারন ক্রেতা-ভোক্তা হিসাবে আমরা সব সময় আমাদের অধিকার গুলি ভোগ করতে চাই। আমরা অধিকার ভোগ করতে গিয়ে আমাদের উপর যে দায়িত্বগুলি বর্তায় তা কিন্তু ভুলে যাই। একজন ক্রেতা-ভোক্তা হিসাবে জাতিসংঘ ঘোষিত ভোক্তা অধিকার গুলি হলো; অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের মৌলিক চাহিদা পুরনের অধিকার, নিরাপদ পণ্য ও সেবা পাওয়ার অধিকার, পণ্যের উপাদান, ব্যবহারবিধি, পাশ্বপ্রতিক্রিয়া ইত্যাদি তথ্য জানার অধিকার, নিরাপদ পণ্য ও সেবা পাওয়ার অধিকার, পণ্যের উপাদান, ব্যবহারবিধি, পাশ্বপ্রতিক্রিয়া ইত্যাদি তথ্য জানার অধিকার, ন্যায্যমুল্যে সঠিক পণ্য ও সেবা পাবার অধিকার, অভিযোগ করার ও প্রতিনিধিত্বের অধিকার, কোন পণ্য বা সেবা ব্যবহারে ক্ষতিগ্রস্থ হলে ক্ষতিপুরণ পাওযার অধিকার, স্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ ও বসবাস করার অধিকার। ঠিক একই সাথে আমাদের রয়েছে ৫টি দায়িত্ব, এগুলি হলো; পণ্য বা সেবার মান ও গুনাগুন সম্পর্কে সচেতন ও জিজ্ঞাসু হওয়া; দরদাম করে সঠিক পণ্যটি বাছাই করা; আপনার আচরনে অন্য ক্রেতা যেন ক্ষতিগ্রস্থ না হন সে ব্যাপারে সচেতন থাকা; পরিবেশর ভারসাম্য রক্ষায় সচেতন ও সক্রিয় হওয়া; ক্রেতা-ভোক্তা হিসাবে অধিকার সংরক্ষনে সেচ্ছার ও সংগঠিত হওয়া। জাতিসংঘ স্বীকৃত ক্রেতা-ভোক্তা অধিকার ও দায়িত্ব হলেও বাংলাদেশর সাধারণ জনগন প্রতিনিয়তই এবং প্রতি পদে পদে এ সমস্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আর দায়িত্ব সম্পর্কে একেবাইকে অজ্ঞ। সরকারী, বেসরকারী বিভিন্ন সংস্থা, জাতীয়, আর্ন্তজাতিক সংস্থা ও বহুজাতিক দাতা গোষ্ঠি দুর্নীতি হ্রাস, সুশাসন ও মানবাধিকার সুরক্ষায় সরব থাকলেও জনগনের নিত্যনৈমত্তিক এ অধিকার লংঘনের বিষয়ে তাদের কোন কার্যকর উদ্যোগ নেই। অথচ এই ক্রেতা-ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করা না গেলেই তৃণমুল পর্যায় থেকেই মানবাধিকার সুরক্ষার স্বপ্ন শুধু মাত্র স্বপ্নই থেকে যাবে।
এখন প্রশ্ন হলো আমরা কি আমাদের অধিকার ও দায়িত্বগুলি সম্পর্কে সচেতন ও জ্ঞাত? যদি তাই হয় তাহলে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরী করে পণ্যের বাজার অস্থিতিশীল করে থাকে। তাহলে ভোক্তা হিসাবে আমরা কেন, তাদের সেই পাল্লায় পা দিব? পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভোক্তারাই পণ্যের নিয়ামক। কারণ ভোক্তারা পণ্যটি ব্যবহার করলেই উৎপাদক লাভবান হবেন। সেকারনে উন্নত দেশগুলিতে ভোক্তাদেরকে রাজা উপাধি প্রদান করা হয়। আর আমরা অনেকেই জানি বাংলাদেশ থেকে রপ্তানী করা গামেন্টস পণ্য ক্রয়ের সময় ইউরোপ ও আমেরিকার ক্রেতা গামেন্টস পণ্যটি হাইজেনিক উপায়ে প্রস্তুত কিনা তা সরেজমিনে দেখার জন্য বাংলাদেশে আসে। ক্রেতাদের আস্থা অর্জনের পরে বিক্রেতা পণ্যগুলি বাজারজাত করতে পারে।
তাই রমজান মাস উপলক্ষে ক্যাব থেকে সম্মানিত ভোক্তাদের কাছে আমাদের আবেদন, দয়া করে একজন ক্রেতা-ভোক্তা হিসাবে আমরা আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যগুলি সম্পর্কে সচেতন হই, দায়িত্ববান হই। একই সাথে এসকাথে একমাসের বাজার না কিনে সম্পাহে সপ্তাহে কিনি। পণ্য ক্রয় করার সময় যাচাই বাচাই করে কিনি। কোন পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেলে তা কেনা ও মজুতের জন্য হণ্য হয়ে না পড়ে খোঁজ খবর নিই, প্রয়োজনে বিকল্প হিসাবে অন্য পণ্য কিনি এবং ঐ পণ্যটি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হই। এছাড়াও যে সমস্ত উৎপাদক, ব্যবসায়ী তিনি পায়কারী ও খুচরা হোক না কেন, যারাই ইচ্ছাকৃত ভাবে বাজারে কৃত্রিম ভাবে পণ্য কেনা বেচায় সংকট তৈরী করছে তাদেরকে বয়কট করি।
তাই আসুন, অবিলম্বে মুনাফাখোর, মজুতকারী, সিন্ডিকেট, ভেজাল, নিন্মমান ও মেয়াদউর্ত্তীন গুড়োদুধ, শিশু খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী আমদানী, গুদামজাত ও বাজারজাতকরনে কৃত্রিম সংকট সৃষ্ঠিতে জড়িত অসৎ ব্যবসায়ী ও এ ধরনের মানববিধ্বংসী কাজে জড়িত ভেজাল মিশ্রণকারী, অসাধু ব্যবসায়ী ও তাদের দোসরদের বাজারজাতকৃত পণ্য ও তাদেরকে সামাজিক ভাবে বয়কট করি। আর ভোক্তা হিসাবে নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হই। সংযমের মাস রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ব্যবহারে সাশ্রয়ী, সংযমী ও দায়িত্ববান হই। তাহলেই নাজাত আসবে।
লাইক:
3
দেখা হয়েছে: ০ বার